শনিবার | ২৪ জুলাই, ২০২১
মহালছড়িতে

মুজিববর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের গৃহ নির্মাণ প্রকল্পে নানা অনিয়মের অভিযোগ

প্রকাশঃ ০২ জুন, ২০২১ ০৪:০৬:৩৬ | আপডেটঃ ২২ জুলাই, ২০২১ ০৮:৪১:০৩  |  ৩১৯
সিএইচটি টুডে ডট কম, খাগড়াছড়ি। খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলায় মুজিববর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের গৃহ নির্মাণ প্রকল্পে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নিম্নমানের কাজের পাশাপাশি উপকারভোগীদের কাছ থেকে টাকা ও নির্মাণসামগ্রী নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া হস্তান্তরের আগেই স্থাপনায় ফাটল দেখা দিয়েছে। এতে সরকারের এ মহৎ উদ্যোগ প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

মহালছড়ি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্প আশ্রয়ণ-(২য় পর্যায়) এর আওতায় উপজেলায় ২৩২টি ভূমিহীন পরিবারকে খাস জমি বন্দোবস্ত দিয়ে একটি সেমি পাকা গৃহ নির্মাণ করে দেয়া হচ্ছে। যার প্রতিটি গৃহ নির্মাণের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৯৭ হাজার টাকা। দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে এসব কাজের তদারকি করছে উপজেলা প্রশাসন (বাস্তবায়ন কমিটি)।

স্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উপকারভোগী ভূমি ও গৃহহীন অনেক পরিবারের কাছ থেকে উপজেলা শহর থেকে ঘরের মালামাল পরিবহন বাবদ টাকা আদায় করা হচ্ছে। এমনকি মিস্ত্রির খরচও বহন করতে হচ্ছে উপকারভোগী পরিবারকে।

প্রকল্পের উপকারভোগী মহালছড়ি উপজেলার চৌংড়াছড়ি গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা শারীরিক প্রতিবন্ধী মোঃ আবুল কাইয়ুম (৩৭) অভিযোগ করে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আমার জন্য ঘর উপহার দিয়েছে শোনে আমি খুশি। কিন্তু ঘর পেলেও টাকা দিতে পারিনাই বলে, কাজের মান তেমন সন্তোষজনক হয়নি। কাজ সমাপ্ত ও হস্তান্তরের আগেই ফাটল দেখা যায়। ঘরের ভাল টিন নিয়ে এসেও ফেরত নিয়ে যায়। টিন ৪৬ এমএম দেওয়ার কথা থাকলেও দিয়েছে ৩৬এমএম। এ ব্যাপারে আমি (কাইয়ুম) চেয়ারম্যান (রতন কুমার) কে জিঙ্গেস করলে তিনি বলেন, টাকা দিলে ভালোটা, নইলে যেটা দে, সেইট্যা নিয়ে থাক। ‘বাইঠ্যা মানুষ, ‘যাক বেটা, মাগনা জিনিস যা পাই তাই ল’। তরে একটা টাকাও সাহায্য করবোনা আর’ এমন কথা বলেছেন বলে জানান তিনি।

প্রকল্পের উপকারভোগী মহালছড়ি উপজেলার সদর ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের থলি পাড়ার উক্রাসং মারমার ভাগিনা নেইদাঅং মারমা অভিযোগ করে বলেন, টাকা দিতে না পারায় ২মাস ধরে কাজ বন্ধ রয়েছে। মামি উক্রাসং দিনমজুরী করে সংসার চালাই। দিনমজুরীর পক্ষে টাকা দিয়ে ঘর নেয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। মামা (উক্রাসং’র স্বামী) চাথোইং মারমা’ অনেক বছর আগে মারা যায়। তারপর থেকে কষ্টে দিন কাটে তার।

প্রকল্পের উপকারভোগী মহালছড়ি উপজেলার মোবাছড়ি ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের কাপ্তাই পাড়ার ফুলাংতি ত্রিপুরার ছেলে রনি ত্রিপুরা অভিযোগ করে বলেন, বাবা চন্দ্র বিকাশ ত্রিপুরা গত ২০১৫সালের আগস্ট মাসে মৃত্যু হয়। মা দিনমজুরী করে। আর আমি টিউশনি করে কোনরকম সংসার চালায়। ছোট বোন রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজে অর্নাসে পড়ে। শুরু থেকে মিস্ত্রিদের খাবার খাওয়াতে হয়। তাছাড়া ঢালাইয়ের কাজে ৩১কেজি রডসহ মিস্ট্রিদের ৪ হাজার টাকা খরচ দিতে হয়েছে। তারপরও নাকি ফ্লোরের  জন্য আমাদেরকে খরচ বহন করতে হবে। কাজের মান তেমন ভালো হয়নি। এরকম ঘর দেয়া চাইতে, না দেয়াই ভালো।

সহকারি মিস্ত্রি মোঃ রফিক বলেন, আমাদের যেগুলো এনে দিচ্ছে সেগুলো দিয়ে আমরা কাজ করি।

এ ব্যাপারে রনি ত্রিপুরাদের ঘর নির্মাণ কাজে দায়িত্বে থাকা ‘ভগদত্ত চাকমা’কে মুঠোফোন করা হলে সংযোগ পায় নি।

প্রকল্পের উপকারভোগী চৌংড়াছড়ি এলাকার ‘নাওরীবাই মারমা’ বলেন, কোন টাকা পয়সা দিতে হয়নি। ইউএনও ম্যাডামও কয়েক বার এসেছিল। তিনি তার ঘরের অসম্পূর্ণ কাজ সম্পন্ন হবে কিনা, এ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন। তবে তিনি এ ব্যাপারে মিডিয়ার সামনে কথা বলতে চাননি।

চৌংড়াছড়ির হ্যাডম্যান পাড়ার প্রকল্পের উপকারভোগী অংশিউ মারমা বলেন, ঘর পেতে ৩০ হাজার টাকা খরচ দিতে হয়েছে। তাছাড়া কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত মিস্ট্রিদের ভাত খাওয়াতে হবে। এ ব্যাপারে প্রতিবেশী ধলাচান মারমা বলেন, খুশি করে সেনাবাহিনীর অবঃ একজনকে নাকি ৩০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। তাছাড়া সিমেন্ট ৩ বস্তাও দিতে হয়েছে বলে জানান তিনি।

এদিকে চৌংড়াছড়ির হেডম্যান পাড়ার অংচাই মারমা বলেন, আমার এলাকায় যতগুলো ঘর পেয়েছে কেউ তাদের টাকা ছাড়া পায়নি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গরিবের জন্য ঘর দিলেও সুবিধা পেয়েছে সচ্ছল পরিবাররা, সুবিধাবঞ্চিত হচ্ছে সত্যিকারে অসচ্ছল ও গৃহহীন গরিব পরিবাররা।

এদিকে, এলাকাবাসীর অভিযোগের ভিত্তিতে গত সোমবার (৩১মে ২০২১খ্রিঃ) সরেজমিনে মহালছড়িতে সংশ্লিষ্ট এলাকায় ঘর নির্মাণে এলাকাবাসীর অভিযোগের সত্যতাও খুঁজে পাওয়া যায়। সরজমিনে দেখা যায়, ওইসব গৃহ নির্মাণে খুবই নিম্নমানের ইট, বালু ব্যবহারের পাশাপাশি সিমেন্ট ও অন্যান্য সামগ্রী যথাযথভাবে ব্যবহার করা হয়নি। ফলে ঘরগুলোর দেয়ালে হাত দিলেই, বালু সিমেন্টের পলেস্তরা খসে পড়তে দেখা যায়।

রাজমিস্ত্রি মনি মারমা বলেন, একটা ঘর তৈরীর জন্য মিস্ট্রি খরচ হিসেবে ২৮ হাজার টাকা পায়। কাজের মান কেমন, বালু, সিমেন্ট কি পরিমাণ ও টিন কত এমএম দিচ্ছেন বলেন জিঙ্গাসা করলে প্রতিনিধিকে তিনি বলেন, সিমেন্ট ৪৫বস্তা, বালু (মহালছড়ি খাল খেকে) ৩ গাড়ি, রড আনুমানিক ৬০ কেজি বলে জানান।   

স্থানীয় মহালছড়ি ইউপি সদস্য মংশিলা মারমা বলেন, আমি মেম্বার হয়েও আমার নিয়ন্ত্রণে একটা ঘরও দিতে পারিনি। প্রধানমন্ত্রীর ঘর নির্মাণে আপনার দৃষ্টিতে কেমন মনে হয়, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমার দৃষ্টিতে খারাপও বলবো না, ভালো বলবো না, মোটামুটি।

চেয়ারম্যানের আস্থাভাজন বাবু মারমা বলেন, চেয়ারম্যান যেহেতু আমার পরিচিত। খুবই আস্থাভাজন ব্যক্তি। সে হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর ঘর উপহার নির্মাণে তদারকি দায়িত্ব আমাকে দিয়েছে তিনি। আপনার দৃষ্টিতে কেমন মনে হয়, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কাজের মান ভালো। টাকা লেনদেনের ব্যাপারে তিনি অস্বীকার করেন।

এ ব্যাপারে ১নং মহালছড়ি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ‘রতন কুমার শীল’ বলেন, কাজের অনিয়ম ও নিম্নমানের হয়েছে বিষয়টি সঠিক নয়। আমার জানামতে সচ্ছল পরিবারের কাউকে দেওয়া হয়নি। কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন করলে, চলমান কাজটি সরেজমিনে ঘুরে দেখার জন্য বলেন। টাকার বিনিময়ে ঘর দেওয়ার ব্যাপারেও তিনি অস্বীকার করেন।

মহালছড়ি উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান জসিম উদ্দীন জানান, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির মাধ্যমে মহালছড়ি উপজেলায় ২৩২টি গৃহ নির্মাণ করে দুস্থদের পুর্নবাসন করা হচ্ছে। কাজে কোন ধরনের নিম্নমান ও অনিয়মের অভিযোগ থাকলে সেটা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেবে।

এ প্রসঙ্গে মহালছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জোবাইদা আক্তার মুঠোফোনে জানান, গৃহ নির্মাণ কাজে কোনও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তাছাড়া চলমান কাজটি যেহেতু ইউএনও থাকাকালীন করা, বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

একটা জিনিস লক্ষ্যনীয় যে, মিস্ট্রি মনি মারমা-দালাল বাবু মারমার সাথে চেয়ারম্যান রতনের ঘর নির্মাণের বাজেটের হিসাব ঠিক নেই। ঘর নির্মাণে মিস্ট্রি হিসাব মতে, যেখানে সিমেন্ট ৪৫বস্তা, বালু ৩গাড়ি, রড ৬০কেজি, টিন ৪২এমএম, অন্যদিকে দালালগিরি করা- বাবু মারমা তার হিসাবে- সিমেন্ট ৪৭বস্তা, বালু ৪গাড়ি ও লোহা ৪৮কেজি, আবার রতন চেয়ারম্যানের হিসাবে- টাস্কফোর্স কমিটি আছে। সবই এরা তদন্ত করে। বাজেটে পুরোটা খরচ করেন বলে জানা যায়।

খাগড়াছড়ি |  আরও খবর
এইমাত্র পাওয়া
আর্কাইভ
সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত, ২০১৭-২০১৮।    Design & developed by: Ribeng IT Solutions