‘দুর্নীতির’ শিক্ষকরা কী নীতি শেখাবেন? প্রান্ত রনি

প্রকাশঃ ০৮ অক্টোবর, ২০২৩ ০৪:৫৭:০৯ | আপডেটঃ ২২ জুন, ২০২৪ ০৪:৫৬:০১
শুক্রবার থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগ প্রসঙ্গে নানান লেখা চাউর হয়ে আসছে। শনিবার বেশ কয়েকটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত একটি খবরে খাগড়াছড়ি জেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের এক সদস্যের বক্তব্যে যেন গভীরে লুকানো সত্যে বেরিয়ে এলো। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ পার্থ ত্রিপুরা জুয়েল বলেছিলেন, ‘শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি ও অনিয়ম হয়েছে। প্রথমে ২৫৭ জনকে নিয়োগ দেওয়ার কথা থাকলেও চূড়ান্ত ফলাফলে ৩৩৭ জনের রোল নম্বর এসেছে। অর্থাৎ ৩৩৭ জনকে চাকরির জন্য মনোনীত করা হয়েছে। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে। প্রথমত, লিখিত পরীক্ষা হয়েছে ত্রুটিপূর্ণ উত্তরপত্রে। দ্বিতীয়ত, মুক্তিযোদ্ধা কোটা সংরক্ষণ করা হয়নি।’

মূলত শিক্ষক নিয়োগের প্রকাশিত চূড়ান্ত ফলাফলে লিখিত পরীক্ষায় পাসের তালিকায় নাম না থাকা এক প্রার্থীর রোল নাম্বার চূড়ান্ত তালিকায় আসার পরপরই আলোচনা সমালোচনার শুরু হয়েছে। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের অভ্যন্তরীণ মত পার্থক্য-বিরোধ, নিয়োগের কোটা ভাগাভাগি কিংবা আত্ম-জিজ্ঞাসার প্রশ্নে- যা’ই হোক না কেন পার্থ ত্রিপুরা জুয়েল যে সত্য বলে ফেলেছেন সেটিই সকলের মাঝে সবচেয়ে বিশ্বাসী ও গ্রহণযোগ্য কথা হয়ে উঠেছে। আর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগকে ‘প্রিন্টিং মিসটেক’ বলে গণমাধ্যমে বক্তব্য দিয়েছেন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান।

দুর্নীতি আর অনিয়মের গল্পের শেষ যেন এখানেই শেষ হয়নি। দিনভর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানান সমালোচনা ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের মাঝেই দিনেদিনে আরেক হুলুস্থুল কান্ড ঘটালো জেলা পরিষদ। লিখিত পরীক্ষায় পাসের তালিকায় না থেকেও চূড়ান্ত নিয়োগের জন্য মনোনীত হওয়া যে রোল নম্বরটি নিয়ে এত আলোচনা সমালোচনা, সেই একটি রোল নম্বর বাদ দিতে গিয়ে আরও চারটি রোল নম্বরে পরিবর্তন এনেছে জেলা পরিষদ! প্রথম চূড়ান্ত তালিকায় প্রকাশিত চার জনের রোল বাদ পড়েছে সংশোধিত চূড়ান্ত মনোনয়ন তালিকায়। এই শিক্ষক নিয়োগে যে অনিয়ম আর দুর্নীতি হয়েছে তার প্রমাণ খোদ জেলা পরিষদই দিয়েছে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়াকে প্রার্থীকে মনোনীত করে এবং পরের আরও চার জনের রোল সংযোজন-বিয়োজন করে। ধরেই নিলাম সর্বশেষে প্রকাশিত তালিকাটি একেবারেই নির্ভুল। তাহলেও তো প্রথমে অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে। আর যদি শেষের তালিকা ভুল হয় সেক্ষেত্রে প্রথম তালিকা কেন’ই বা সংশোধন করা লাগবে? আপনারা (জেলা পরিষদ) যে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম-দুর্নীতি করেননি তার প্রমাণ জনতার কাঠগোড়ায় দিন কিংবা না দিন; তবে নিজেদের আত্ম-জিজ্ঞাসা করবেন।

খাগড়াছড়ির বাসিন্দা এক প্রবাসী ভিডিও ক্রিয়েটর তার তৈরি একটি ভিডিওতে দাবি করেছেন খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে তার এক বন্ধুরও চাকরি হয়েছে; যাকে কিনা শিক্ষা জীবনে তারা পরীক্ষায় সময়ে সহযোগিতা করে এসেছিলেন। চাকরির জন্য মনোনীত হওয়া সেই বন্ধুকে কিভাবে বাচ্চাদের পড়াবে এমন প্রশ্ন করায় তিনি প্রতি উত্তরে বলেছেন, ‘কিভাবে কী পড়াব তার থেকে টাকা কিভাবে তুলবেন সেই নিয়ে ভাবছেন।’ ওই ভিডিও ক্রিয়েটর দাবি তুলেছেন তার চাকরি হওয়ার পেছনে যোগ্যতার ক্ষেত্রে ঘুষের টাকাও ভূমিকা রেখেছে। এই কথা কেবল ওই ভিডিও ক্রিয়েটরের নয়; খাগড়াছড়ি জেলার বাহিরেও তিন পার্বত্য জেলার মানুষ প্রাথমিকের মতো গুরুত্বপূণ শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে হাস্যরত করছেন। কেবল এবারই খাগড়াছড়ি প্রথম তা নয়, পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোর বিভিন্ন নিয়োগ-দুর্নীতির এসব অভিযোগ যেন ‘সংস্কৃতি’তে পরিণত হয়। এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে চাওয়া মানুষকে কিভাবে বুঝ দেবে এই প্রতিষ্ঠানগুলো- সেই প্রশ্ন রাখলাম।

নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ক্ষেত্রে সব নিয়োগ স্বচ্ছ হতে হবে এটাই নিয়ম। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রে যে ব্যবস্থা, কাঠামোর তৈরি হয়েছে সেখানে এই স্বচ্ছতার আশা অনেক ক্ষেত্রে বাড়তি আশা হয়েই যেন দাঁড়ায়। তবুও শিক্ষক নিয়োগ, ডাক্তার নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ কিছু নিয়োগের ক্ষেত্রে অনিয়ম-দুর্নীতি পুরো সমাজ জাতিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। এই যে শিক্ষক নিয়োগ দেবেন, যে শিক্ষক নিজেই ভালো জানেন না, নীতিনিষ্ঠ নন; তিনি আপনার-আমাদের সন্তানদের কী পড়াবেন? কোন শিক্ষা দেবেন আর কোন নীতিই শেখাবেন যিনি নিজেই নিয়োগ পেলেন দুর্নীতির মাধ্যমে। আবার ডাক্তার নিয়োগের ক্ষেত্রেও যদি সঠিক মানুষ নিয়োগপ্রাপ্ত না পান সেখানে মানুষ ভুল চিকিৎসায় মারা যাবেন। এর আক্রান্ত হবো আমি-আপনিই। আবার নিয়োগের ক্ষেত্রে অস্বচ্ছতার প্রভাব পড়ছে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রেও। তখন দুর্নীতি, লুটপাট হয়ে ওঠে নিত্যসঙ্গী। এরকম অনেক বিভাগ-প্রতিষ্ঠান রয়েছে সেগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে বারংবার ভাবা দরকার। যাতে আপনাদের মানুষের গালি শুনতে না হয়, অভিশাপ বরণ করতে না হয়।

আরেকটি কথা বলতেই হয় পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাথমিক শিক্ষায় ‘বর্গা শিক্ষকের’ প্রচলন পুরনো বলেই সমাদৃত। বিশেষ করে যারা ক্ষমতা-দাপটের সঙ্গে সম্পৃক্ত, তাদের পরিবার, আত্মীয়-স্বজনরাই বেশির ভাগ বর্গা শিক্ষকপন্থার পেছনে বেশি জড়িত। প্রাথমিকের এসব শিক্ষকরা বিদ্যালয়ে যান না। বিদ্যালয়ে বর্গা আরেকজন শিক্ষক রেখে তারা নিজেদের চাকরি টিকিয়ে রাখেন। সাধারণ মানুষের ভাষ্যে, বিগত দিনের চেয়ে বর্তমানে এই অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন হয়ে আসলেও এখনো চলমান আছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন, বিদ্যালয় পাঠদানে তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করুন।

নিয়োগের দুর্নীতি-অনিয়মের এই চিত্র কেবল দেশের পার্বত্য অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও চাকরি বাণিজ্য ঢুকে পড়েছে। এই বাণিজ্যের কারণে অনেকাংশে মেধাবী ও যোগ্যতা চাকরি পান না কেবল ঘুষের টাকা এবং কার্যকরী লবিস্ট না থাকায়। যে কোনো চাকরির ক্ষেত্রে যদি যোগ্য আর মেধার চেয়ে ঘুষের টাকার জোর বেশি হয়ে যায় সেখানে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি অসৎ ও দুর্নীতিবাজ হবেন এটাই চিরন্তন সত্য। বলা হয় অনেককটা চাকরির বাণিজ্য প্রথা ও অনিয়মের অনিয়মই দুর্নীতিবাজ ও অসৎ জনবল, কর্মকর্তা-কর্মচারী তৈরি করেছে। এই প্রথা আর অনিয়মকে নিয়মে পরিণত কিন্তু সাধারণ মানুষ করেননি। যারা কর্তৃপক্ষের আসনে আসীন আছেন। নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, কর্মকর্তা হয়েছেন তারাই এই অপসংস্কৃতির উদ্ভব ঘটিয়েছেন। মানুষকে অসৎ ও দুর্নীতিবাজ হিসাবে তৈরিতে তাদের জন্য জনতার পক্ষ থেকে বিশেষ পদক দেয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।

বিভিন্ন সময়েই বিভিন্ন চাকরির নিয়োগ কান্ডে দেখা গিয়েছে একটি নিয়োগের জন্য ১০-১৫ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়া হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে তারও বেশি, তারও কম। কিন্তু যেসব পদের বিপরীতের ঘুষের টাকা নেওয়া হচ্ছে বেশির ভাগ মানুষ চাকরি পেলেও ঘুষের টাকা আয় করে তুললেই লেগে যাবে কয়েকবছর। তাহলে চাকরি পাওয়া লোক কী বেতন তুলে সংসারের জন্য ব্যয় করবেন নাকি ঘুষের টাকা শোধ করবেন। বাধ্য হয়ে তারা নিজের খরচ, সংসার ও ঘুষের টাকা উত্তোলনের জন্য অনিয়ম-দুর্নীতির নিত্য দ্বারস্থ হন। এর জন্য দায়ী কি শুধু ঘুষ গ্রহণকারী। এর জন্য দায়ী প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে জড়িত সবাই।

অনিয়ম-দুর্নীতি করেও বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান এবং কর্মকর্তা রেহাই পেয়ে যান। এসব কারণে মানুষের মধ্যেও এখানকার সময়ে যে বিষয়টি দাঁড়িয়েছে সেটি হলো প্রতিবাদ না করা। প্রতিবাদবিমুখ মানুষের বেড়েছে বিগত দিনে। মানুষ মনে করতে শুরু করেছেন, এসব প্রতিবাদ, হাঙ্গামার চেয়ে ঘুষ দিয়ে ‘সোনার হরিণ’ নামের সরকারি চাকরি নিশ্চিত হলেই জীবন সুরক্ষিত। এই চিন্তা-চেতনাকে ধ্বংস করা জরুরি। প্রতিবাদ করতেই হবে। কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতেই হবে। যারা এসব নিয়োগ বাণিজ্য, ঘুষ প্রথার পেছনে রয়েছেন আমাদের কাছে অনুরোধ নিজেকে প্রশ্ন করুন, আপনি ঠিক কোন কাজটি করছেন। সব এডিটে (নিরীক্ষা), নিয়ম-অনিয়মের হেরফেরে চূড়ান্তভাবে জয়ী হলেও নীতির প্রশ্নে, আত্ম-জিজ্ঞাসার প্রশ্নে আপনি কি বিজয়ী হবেন?

লেখক: সাংবাদিক ও আলোকচিত্রী


সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত, ২০১৭-২০১৮।    Design & developed by: Ribeng IT Solutions