শিরোনামঃ

বির্বণ এক শহরের নাম রাঙামাটি

বিশেষ প্রতিবেদন,সিএইচটি টুডে ডট কম, রাঙামাটি। বির্বণ এক শহরের নাম রাঙামাটি। এক সময় লেক-পাহাড়ের শহর রাঙামাটি বেড়াতে এসে যে কোনো পর্যটক অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হতেন। সবুজ পথ পাচালি আর শহরের সুন্দর পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাস্তাঘাট যে কারো মন ভরে যেত। অথচ দশ আগের রাঙামাটি শহর আর দশ বছর পরের রাঙামাটি

বাস টার্মিনালে বাস নেই, আছে ট্র্রাক

বাস টার্মিনালে বাস নেই, আছে ট্র্রাক

শহরকে চেনা দায়। এখন সবুজ পাহাড় কিংবা স্বপ্নিল হ্রদ দেখতে আসা আগন্তুক হতাশ হন বিবর্ণ রাঙামাটি দেখে। দখলবাজরা কেড়ে নিয়েছে রাঙামাটি শহরের সেই মুগ্ধতা। অপরূপা রাঙামাটিকে দিয়েছে বস্তির শহরের ‘খ্যাতি’। সরকারি কিংবা খাসজমি, হোক কোনো প্রতিষ্ঠানের জমি, দখলবাজদের ‘কালো চোখ’ থেকে রক্ষা পায়নি কিছুই। শহরের শ্মশান, বাস টার্মিনাল, কলেজের জমিসহ বেদখল হয়ে গেছে যেন পুরো শহরই। মাঝে মাঝে মনে হয় অসহায় এই শহরকে দেখার মনে হয় কেউ নেই। এই মাটি ও মানুষের প্রতি কারো যেন ভালোবাসা মায়া মমতা নেই। মাঝে মাঝে মনে হয় এখানে কোন প্রশাসন নেই।

পত্রিকায় বা টেলিভিশনে রিপোর্টিং এর জন্য কর্তা বাবুদের কাছে গেলে কথা বলতে চান না, আবার কথা বললেও বলেন আমার আমলে হয়নি। এ নিয়ে বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা সভায় আলোচনা হয় মাঝে মাঝে লোক দেখানো অভিযান চললেও অভিযানের পর সবই চলে আগের মতো।

রাঙামাটি শহরের মানিকছড়ি থেকে শুরু করে ডিসি বাংলো পর্যন্ত সড়কের পাশে কোথাও একটু জায়গা নেই। খাস জায়গাগুলোকে নিজেদের বাপ দাদার সম্পত্তি মনে করে যে যেখানে পেরেছে দখল করেছে। আমাদের রাজনীতিবিদদের কেউ কেউ আবার এসব দখলকে সমর্থন করেন। কেউ বলেন বিএনপির আমলে তাদের নেতা কর্মীরা দখল করতে পারলে আমরা কেন পারব না, আবার কোন কোন জায়গা বিএনপি আওয়ামীলীগ মিলে দখল করেছে। শহরে ফুটপাত নেই বললে-ই চলে।
এক সময় শহরের প্রবেশ মুখ মানিকছড়িতে প্রবেশ মুখে টিভি ও রেডিও সেন্টারের আশ পাশে ছিল সবুজ প্রকৃতি আর পাহাড়। পর্যটকরা শহরে ঢোকার সময় সেখানে নেমে ছবি তুলত আর সেখানে জায়গা দখল করে গড়ে উঠেছে বস্তি। আর বস্তি করার সময় পাহাড়ী বাঙ্গালীর মধ্যে আবার সম্প্রীতি ছিল। বছরের কয়েক এর মধ্যে এসব স্থাপনা গড়ে উঠলেও প্রশাসন এসব স্থাপন উচ্ছেদে কোন ব্যবস্থা তো নেয়নি বরং অবৈধ স্থাপনকারীদের বৈধতা দেয়ার জন্য কিছু রাজনীতিবিদ উঠে পড়ে লেগেছেন। সেখানে এলাকার নাম দিয়ে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হচ্ছে। ভেদভেদী এলাকায় সড়কের জায়গা দখল করে ঘেরা বেড়া দিয়ে রেখেছে ক্ষমতাসীন দলের কেউ কেউ। কলেজ গেইট এলাকায় সড়ক ও জনপথ বিভাগের তত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর অফিস সংলগ্ন খোলামেলা জায়গা ছিল বছর খানেক আওয়ামীলীগ, বিএনপি এবং জেএসএসের কতিপয় নেতা কর্মী সেব সব জায়গা দখল করে নিয়েছে। কেউ কেউ স্থাপনা তৈরি করে বিক্রি করেছেন কেউবা দোকান ঘর ভাড়া দিয়েছেন।
রাঙামাটি বাস টার্মিনাল এলাকা ২০১২ সনের মে মাসের দিকে দখল করে দখলবাজরা দোকান ঘর তোলে ভাড়া দিলেও অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে প্রশাসন কোন ব্যবস্থা নেয়নি। উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ এনে দখলবাজরা দিব্যি ব্যবসা বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। বাস মালিক সমিতি অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে আন্দোলন করলেও দখলবাজদের হুমকির মুখে তাদের আন্দোলন থমকে যায়। বাস টার্মিনালে এখন আর বাস নেই, আছে ট্রাক।
শহরের এসপি অফিসের সামনের রাঙামাটি সরকারি মহিলা কলেজের সড়কটিও দখলবাজদের কুনজর থেকে মুক্তি পায়নি। দখল করতে করতে দখলবাজরা এই সড়কটিকে এতটাই সংকুচিত করে ফেলেছে যে কোনো কোনো বাড়ির থুথু কিংবা নোংরা পানি কলেজ ছাত্রীদের শরীরে পড়া নিত্যদিনের ঘটনা।

কলেজ গেইট এলাকায় সড়ক ও জনপথের জায়গা দখল করে এভাবে ঘেরাবেড়া দিয়েছে দখলকারীরা

কলেজ গেইট এলাকায় সড়ক ও জনপথের জায়গা দখল করে এভাবে ঘেরাবেড়া দিয়েছে দখলকারীরা

শহরের পুলিশ লাইন ও ডিসি বাংলো এলাকাটি এক দশক আগেও সবচেয়ে নির্জন এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু মাত্র এক দশকেই সেখানে একশতক খালি জায়গা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। হাজার হাজার বসতি সেখানে। যার বেশির ভাগই খোদ পুলিশ, রাঙামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জনের মালিকানায় কিংবা সরকারি খাস জায়গা!
একসময় শহরের সবচেয়ে বড় খোলামেলা জায়গা হিসেবে পরিচিত ছিল চিতাখোলা। যেখানে করা হতো হিন্দুদের শবদাহ। কিন্তু মাত্র ১০ বছরের ব্যবধানেই পাল্টে গেছে সেখানকার মানচিত্র। শ্মশান উধাও হয়ে সেখানে এখন বিশাল বসতি, যার নামকরণ হয়েছে ‘শান্তিনগর’!

আবাসিক এলাকা হিসেবে পরিচিত তবলছড়ি এলাকায় বেশির ভাগ সরকারি কোয়ার্টার সংলগ্ন খালি জায়গা দখল করে নিজেদের বসতি বানিয়েছেন ওই কোয়ার্টারে থাকা স্টাফরাই। সেখানে একটি কোয়ার্টারও পাওয়া যাবে না, যেখানে কোনো খালি জায়গা আছে। ওই এলাকার ওয়াপদা কলোনির বিএডিসি পার্ক এখন দখলবাজদের বস্তি, আসামবস্তি-তবলছড়ি সংযোগ বাঁধও বেদখলের ঝুঁকিতে। পর্যটন কমপ্লেক্সে সীমানার বাইরের এলাকাগুলোও দখল হয়ে গেছে অনেক আগেই।
পুরো শহরের সব স্থানেই দখলবাজদের কর্তৃত্ব। ঘনবসিতপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত বনরূপা, রিজার্ভবাজার কিংবা তবলছড়ি বাজারেও এখন দখলবাজদের পোয়াবারো। হ্রদের ওপর পিলার বা খুঁটি গেড়ে প্রতিনিয়তই তৈরি হচ্ছে স্থাপনা।

রাঙামাটিতে অবৈধ দখলের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অপরূপা কাপ্তাই হ্রদ। রাঙামাটি শহরের তিনদিকে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা এই হ্রদ দখল করতে করতে এর অস্তিত্বই গিলতে চাইছে দখলবাজরা। শহরের রিজার্ভবাজার, বনরূপা, গর্জনতলি, তবলছড়ি, পুলিশ লাইন, পুরাতন বাসস্টেশন এলাকাসহ চারপাশেই হ্রদের ওপর স্থাপনা চোখে পড়ে। হ্রদের ওপর স্থাপনা নির্মাণ ছাড়াও এসব স্থাপনার পয়োনিষ্কাশন লাইনও সরাসরি দেওয়া হয় হ্রদের জলে। ফলে শহরবাসীর খাবার ও ব্যবহার্য পানির প্রধান উৎসটি ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিপন্ন হচ্ছে কাপ্তাইয়ের স্বাদের মাছ। হ্রদের পানিতে বাড়ছে কলিফর্মসহ বিভিন্ন ক্ষতিকারক জীবাণুর উপস্থিতি।
সবচেয়ে আশ্চর্য্যর বিষয় হচ্ছে কাপ্তাই লেক ঘেষে যারা বসতি স্থাপন করেছেন তাদের জায়গা যদি থাকে ৫ শতক তাহলে লেকের পানির জায়গা করেছে আরো ৫শতক। সেখানে বসতি নির্মানসহ পয়:নিস্কাসন ব্যবস্থা পুরোটা করেছে লেকের উপর। বিশেষ করে শহরের অধিকাংশ হোটেল তৈরি করা হয়েছে কাপ্তাই লেকের উপর জায়গা দখল করে।
অবৈধ দখলদার উচ্ছেদে আশার আলো জাগিয়েছিলেন সাবেক রাঙামাটি জেলা প্রশাসক মোস্তফা কামাল, তিনি অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন তার আমলে রাঙামাটি পার্ককে অবৈধ দখলদারমুক্ত করা, শহরের ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা, স্পর্শকাতর ফরেস্ট রোড ও বনরূপা বাজার দখলমুক্ত করা, শহরের বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। মোস্তফা কামাল রাঙামাটি থেকে চলে যাওয়ার পর সেই আশার আলোয় আবার ভাটা পড়েছে।

রেডিও এবং টিভি সেন্টার এলাকায় এভাবে ঝুকিপুর্নভাবে ঘর বাড়ী তৈরি করা হয়েছে

রেডিও এবং টিভি সেন্টার এলাকায় এভাবে ঝুকিপুর্নভাবে ঘর বাড়ী তৈরি করা হয়েছে

অন্যদিকে সরকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে একর পর একর জায়গা বন্দোবস্তী দেয়ায় শহরে আর খালি জায়গা নেই বললে চলে। আবার বৈধভাবে জায়গার জন্য আবেদন করেও অনেকে জায়গা পাননি, দখলবাজদেরও বৈধতা দেয়া হচ্ছে প্রশাসন থেকে এমনও অভিযোগ উঠেছে।
কলেজ গেইট এলাকায় রাঙামাটি সড়ক ও জনপথের জায়গা দখল বিষয়ে কথা বলতে গেলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, আমরা অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করতে গিয়েছিলাম কিন্তু দখলদার ও রাজনৈতিক বাধার কারনে ফিরে আসতে হয়েছে।
রাঙামাটি বাস টার্মিনাল বিষয়ে সড়ক পরিবহন কো অপারেটিভের সভাপতি আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, বাস টার্মিনাল বিষয়ে দখলবাজরা রাঙামাটি জজ আদালতে মামলা করলে সেখানে হেরে যায়, পরে তারা উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ এনে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বাস টার্মিনাল উন্নয়নে বোর্ডের নিয়ন্ত্রনাধীন হলেও তারা আশানুরুপ কিছু করছে না।
রাঙামাটির জায়গা দখল বিষয়ে জেলা প্রশাসক সামসুল আরেফীন বলেন, আমি যোগদানের পর কোন জায়গা দখল হয়নি, আর যার জায়গা রক্ষনাবেক্ষন করা তার দায়িত্ব, আমরা কতটুকু বা করতে পারি। আমাদের কাছে কেউ সহযোগিতা চাইলে করব।

Print Friendly, PDF & Email

Share This:

খবরটি 329 বার পঠিত হয়েছে


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*
*

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.

ChtToday DOT COMschliessen
oeffnen