শিরোনামঃ

পার্বত্য ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন নিয়ে নানা মত

ফারহান রহমান তানভীর, সিএইচটি টুডে ডট কম। গত ১লা আগষ্ট মন্ত্রীসভায় অনুমোদন হওয়া এবং ৯আগষ্ট রাষ্ট্রপতি কর্তৃক অধ্যাদেশ আকারে জারি হওয়ার পর পার্বত্য বাঙালী সংগঠনগুলো পার্বত্য চট্টগ্রাম ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ ও হরতাল করেছে।DSC00144 অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম পার্বত্য চট্টগ্রাম ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনকে কাজ করতে দেয়ার আহবান জানিয়েছেন চাকমা ব্যারিষ্টার দেবাশীষ রায় এবং সংসদ সদস্য উষাতন তালুকদার। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগীদের সংসদ সদস্য ফিরোজা চিনুর দাবি প্রধানমন্ত্রী এমন কোন কাজ করবেন না যাতে বাঙালীদের ক্ষতি করে, আওয়ামীলীগ সহবস্থানে বিশ্বাসী। বাঙালী নেতারা একে সকলের কাছে গ্রহনযোগ্য করে তুলতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আহবান জানিয়েছে।

১৯৯৭ সনে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার পর চুক্তি অনুযায়ী পাহাড়েরর মুল সমস্যা ভুমি সমস্যা নিরসনে ১৯৯৯ সনে ভুমি কমিশন গঠন করা হয় এবং ২০০১ সনে ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন করা হয়। তখন থেকে আইনটি বাতিলের দাবিতে বাঙালীরা এবং আইনটি সংশোধনের দাবিতে জনসংহতি সমিতি আন্দোলন করে আসছে। ২০১৩ সনে সরকার আইনটি সংশোধনের উদ্যেগ নিলেও আন্দোলনের মুখে সেটি বেশীদুর এগোয়নি। সবশেষ ২০১৫ সনে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে এক বৈঠকে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ প্রস্তাবিত ২৩টি ধারার মধ্যে সরকার এবং আঞ্চলিক পরিষদের সাথে মতৈক্য হয়। তারই ভিত্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন গত ১লা আগষ্ট মন্ত্রীসভায় অনুমোদন এবং ৯আগষ্ট রাষ্ট্রপতি কর্তৃক অধ্যাদেশ আকারে জারি হয়। আইনে ভুমি কমিশনের চেয়ারম্যানের ক্ষমতা কমিয়ে কমিয়ে কোরাম পুরনে ৩জনের স্থলে ৪জন, কমিশনে উপজাতীয়দের থেকে কর্মকর্তা কর্মচারী নিয়োগে অগ্রাধিকার প্রদান এবং বন্দোবস্তী জমি বাতিলের করাসহ ১৩টি সংশোধনী আনা হয়। অধ্যাদেশ আকারে জারি হওয়ার পর বাঙালীরা এটি বাতিলের দাবিতে আন্দোলনে নামে। চাকমা ব্যারিষ্টার দেবাশীষ রায় এবং সংসদ সদস্য উষাতন তালুকদার আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম পার্বত্য চট্টগ্রাম ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনকে কাজ করতে দেয়ার আহবান জানিয়েছেন। তারা বলেছেন ভুমি কমিশন কাজ শুরু করলে যদি কারো প্রতি অবিচার করা হয় তাহলে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রীম কোর্টে আপীলের সুযোগ রয়েছে । সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য ফিরোজা বেগম চিনু বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী এমন কোন কাজ করবেন যাতে বাঙালীদের ক্ষতি হয়, কারন আওয়ামীলীগ সহাবস্থানে বিশ্বাসী।

চাকমা রাজা ব্যারিষ্টার দেবাশীষ রায় বলেছেন, ভুমি কমিশন আইন এতদিন ডিপ ফ্রিজে ছিল, সরকারের বোধদয় হওয়াতে মন্ত্রীসভাতে এটিকে নীতিগত অনুমোদন এবং পরে মহামান্য রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ আকারে জারি করেছে। এতে বরফ কিছুটা গলতে শুরু করেছে। আগে কোরাম সংকট ছিল, যে কোন সিদ্ধান্তের ব্যাপারে চেয়ারম্যানের একক ক্ষমতা ছিল সেটি কমিয়ে আনা হয়েছে। যুক্ত হয়েছে কমিশনে রীতি নীতি প্রথাগত আইন এবং কর্মকর্তা কর্মচারী নিয়োগে পাহাড়ীদের অগ্রাধিকার কথা। শান্তি চুক্তির বড় অংশ হচ্ছে ভুমি বিরোধ এটি বাস্তবায়ন করলে চুক্তির অনেকাংশে বাস্তবায়ন হবে।P1060402-
বাঙালীদের আশংকার বিষয়ে রাজা ব্যারিষ্টার দেবাশীষ রায় আরো বলেন, আশংকার কিছু নেই, সংখ্যা গরিষ্ঠ পাহাড়ী সদস্য থাকলেও কমিশনে চেয়ারম্যান সুপ্রীম কোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার রয়েছেন। ভুমি কমিশন আইনে আপীল শব্দটি না থাকলে ভুমি কমিশন যদি বৈষম্যে আচরন করে তাহলে এর বিরুদ্ধে সুপ্রীম কোর্টে রিভিউ করা যাবে।

তিনি আরো বলেন, শান্তি চুক্তির অনেক বিষয় অবাস্তবায়িত বা আংশিক বাস্তবায়ন হলেও একটি বিষয় পুরো অবাস্তবায়িত রয়ে গেছে সেটি হলো আভ্যন্তীরন শরণার্থী পুর্নবাসন, তাদের একটি তালিকা করা হলেও সামগ্রিক পুর্নবাসন তো দুরের কথা তাদের খাদ্য নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, আবাসন কিছুই করা হয়নি। অনেকে সাজেকে এবং কাচালং রিজার্ভ ফরেষ্টে ছিটিয়ে রয়েছে। তাদের সার্বিক পুর্নবাসন কোথায় হবে সেটিও নির্ধারন করা হয়নি, ভুমি কমিশন কাজ শুরু করলে আভ্যন্তরীন শরনার্থী এবং ভারত প্রত্যাগত শরনার্থীদের বিষয়টা যুক্ত হতে পারে।

তিনি আরো বলেন, চুক্তিতে আছে সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হবে, যা-ই থাকবে সেটি নেহাত কম নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে এখন আগের মত সশ¯্র সংঘাত নেই, যা আছে এটি পুলিশ নিয়ন্ত্রন করতে পারবে। চুক্তিতে বেসামরিকীকরনের যে কথা বলা হয়েছে সেটি করা হয়নি।

তিনি আরো বলেন, ভুমি পার্বত্য জেলা পরিষদে হস্তান্তরের কথা সেটি করা হয়নি, এখনো ডেপুটি কমিশনারগন আগের মত ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। ১৯০০ সনের হিল ট্যাক্টস ম্যানুয়েল যা যা জেলা পরিষদের আইনের সাথে সাংঘর্ষিক তা সংশোধন করতে হবে।

রাঙামাটির নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় নেতা উষাতন তালুকদার বাঙালীদের আপত্তির ব্যাপারে বলেছেন, আগে ভুমি কমিশনকে কাজ করতে দেন যদি তারা ভুল করে আমরা তখন প্রতিবাদ করতে পারব,ভুমি কমিশন যদি আপনার জায়গা নির্ধারন করে দেয় তখন অন্য কেউ তার জায়গা দাবি করতে পারবে না। যারা ভুমি বিরোধ কমিশনে রয়েছেন তারা সবাই দায়িত্বশীল ব্যাক্তি তারা দায়িত্বশীলতার সাথে দায়িত্ব পালন করবেন।ZZ

তিনি আরো বলেন, আজকে দেশে যেখানে জঙ্গীবাদ মাথাছাড়া দিয়ে উঠছে সেখানে ছোট খাট বিষয় নিয়ে আমরা বিবাদে না জড়াই। আমরা জাতীয় স্বার্থে আমরা ঐক্যবদ্ধ হই। ভুমি বিরোধ যদি ধীরে ধীরে কমে যায় তাহলে এখানকার সমস্যা বহুলাংশে কমে যাবে।

 

 

 

ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য ফিরোজা বেগম চিনু বলেছেন, আমরা দেখেছি ভুমি কমিশনের যখন মিটিং ডাকা হয় সবাই উপস্থিত থাকলেও যাদের সাথে চুক্তি হয়েছে তারা সভায় যান না, কোরাম পুরন হয় না তাই কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। কেবিনেটের মাধ্যমে অর্ডিনেন্স আকারে ভুমি কমিশন আইন পাস হলেও এটি সংসদে যাবে যাচাই বাছাই হবে, স্থায়ী কমিটিতে যাবে পরে সংসদে পাস হবে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এমন কোন কাজ করবেন না যাতে অন্যর ক্ষতি হয়, আমরা সহাবস্থানে বিশ্বাসী। কারন তার পিতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আন্দোলনের ফসল আজকের বাংলাদেশ, জননেত্রী শেখ হাসিনাও গরীব দু:খী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে আন্দোলন সংগ্রাম করেছেন।

তিনি বাঙালীদের আশংকার বিষয়ে বলেন, আমি বিশ্বাস করি জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এমন কোন কাজ করবেন না যেখানে বাঙালীরা চলে যেতে হবে, কারন আওয়ামীলীগ অসম্প্রদায়িক দল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিশ্বাসী। এখানে সকলের বসবাস করার অধিকার রয়েছে। আমরা চাই না অন্যায়ভাবে কেউ কারো জায়গা দখল করে থাকুক। আমার মনে হয় ভুমি কমিশন সর্ম্পকে ভীতির কারনে অথবা ভুল বোঝাবুঝির কারনে তারা আন্দোলন করছে। আন্দোলন গনতান্ত্রিক অধিকার যে কেউ আন্দোলন করতে পারে তবে সেটি যেন কোনভাবে সাম্প্রদায়িক রুপ না নেয় সে জন্য আমাদের সর্তক থাকতে হবে।Mp Chinu_0002

তিনি আরো বলেন, আমার দৃঢ় বিশ্বাস মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সজাগ দৃষ্টি রেখে পাহাড়ের ভুমি সমস্যার একটি গ্রহনযোগ্য সমাধান দিবেন।

 

 

 

 

 
পার্বত্য বাঙালী পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাব্বির আহম্মদ বলেছেন, এই আইনটি পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালীদের বিতাড়িত করার একটি চক্রান্ত। ভুমি কমিশন সভায় কোরাম পুরনে সুপ্রীম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি চেয়ারম্যান ও বিভাগীয় কমিশনার সদস্য থাকলেও যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার কথা বলা হয়েছে তাতে সদস্য সবাই পাহাড়ী, সেক্ষেত্রে সব সিদ্ধান্ত তাদের পক্ষে এবং বাঙালীদের বিপক্ষে যাবে। এছাড়া ১৯৮৪সন থেকে পার্বত্য এলাকায় ভুমি বন্দোবস্ত বন্ধ রয়েছে , বছরের পর বছর যারা বসবাস করছেন কেবল কাগজ পত্র না থাকার কারনে তারা ভুমি হারা হবেন অন্যদিকে পাহাড়ীরা প্রথাগত আইনের কারনে কাগজ পত্র না থাকলেও ভুমির মালিক হবেন। যে ১৩টি সংশোধনী আনা হয়েছে তা বাঙালীদের অধিকারের পরিপন্থী এবং সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক।Synk sabbir_0004

তিনি সব সম্প্রদায়ের কাছে একটি গ্রহনযোগ্য আইন করতে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আর্কষন করেন।

 

 

 

 

 

পার্বত্য চট্টগ্রামের মুল সমস্যা ভুমি, ভুমি কমিশন বা সরকার পাহাড়ের ভুমি সমস্যা সমাধানে সকলের গ্রহনযোগ্য একটি সমাধান খুজে বের করবেন এমন প্রত্যাশা পাহাড়ে বসবাসরত সকল জনগোষ্ঠীর।

on

খবরটি 461 বার পঠিত হয়েছে


Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*
*

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.

ChtToday DOT COMschliessen
oeffnen