শিরোনামঃ

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির দুই দশক

পর্দার পেছনের মানুষগুলোর খবর কেউ রাখেনি

নুরুচ্ছাফা মানিক, খাগড়াছড়ি। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির দুই দশক পূর্তি আজ। নানা আয়োজনে রাজধানী ঢাকাসহ তিন পার্বত্য জেলা ও বরিশাল জেলায় দিবসটি উদযাপনে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সরকার, জাতীয় ও স্থানীয় রাজনৈতিক অনেক সংগঠন। ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর চুক্তি স্বাক্ষরের পূর্বে সরকার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সাথে যোগাযোগের জন্য গঠিত কমিটির যেসব সদস্যরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শান্তি বাহিনীর সাথে যোগাযোগ করেছিলেন তাদের অবদানের স্বীকৃতি কাগজে কলমে কোথাও উল্লেখ নেই। প্রতিবছর চুক্তির বর্ষপূর্তি পালনে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হলেও চুক্তি স্বাক্ষরে পেছনে যোগাযোগ কমিটির সদস্যদের অবদানের কথা দিনদিন যেন ভুলতে বসেছে পার্বত্যবাসী।
১লা ডিসেম্বর সন্ধ্যায় সরকার এবং জনসংহতি সমিতির সাথে যোগাযোগ কমিটির সদস্য বর্তমান খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এসএম শফি একান্ত সাক্ষাতকারে মুখোমুখি হন।

প্রতিবেদক: কেমন আছেন?
এসএম শফি: শারীরিক অবস্থা ভাল নয়। বয়সের সাথে সাথে নানা রকম রোগব্যাধিতে শরীরে বাসা বেধেছে।

প্রতিবেদক: পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরে যোগাযোগ কমিটি কি কাজ করেছিল?
এসএম শফি: পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের নৈপথ্যে যোগাযোগ কমিটির অবদান অপরিসীম। সরকারের সাথে শান্তি বাহিনী তথা পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সংলাপের প্রাথমিক ধাপ গ্রহণ করেছিল যোগাযোগ কমিটি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে তৎকালীন গোলাবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান হংধ্বজ চাকমাকে আহ্বায়ক করে পার্বত্য চট্টগ্রাম যোগাযোগ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির বাকী সদস্যরা হলেন, পেরাছড়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পুরুষোত্তম চাকমা, ইউপি মেম্বার অরুণ উদয় চাকমা, সমাজসেবক নকুল চন্দ্র ত্রিপুরা, মো: শফি, অংক্যচিং মারমা, চাইথোয়াইপ্রু চৌধুরীসহ আরও অনেকেই। পানছড়ির পূজগাং ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে শান্তি বাহিনীদের সাথে সরকার পক্ষের প্রথম যে সংলাপ হয়েছিল সে সংলাপের প্রস্তুতি করেছিল যোগাযোগ কমিটি। তৎকালীন খাগড়াছড়ি রিজিয়নের কমান্ডার ব্রি: জেনারেল সৈয়দ মো: ইব্রাহিমের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের সামরিক একটি কমিটি শান্তি বাহিনীর তৎকালীন নেতা ও বর্তমান রাঙামাটি সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্য ঊষাতন তালুকদারের নেতৃত্বে ৫ জন গেরিলা নেতা প্রথম সংলাপে মিলিত হন। পরবর্তীতে চুক্তি স্বাক্ষরের আগে পর্যন্ত সরকারের সাথে শান্তি বাহিনীর যেসব বৈঠক হয়েছিল প্রতিটি বৈঠকের জন্য যোগাযোগ কমিটির সদস্যদের ঝুঁকি গ্রহণ করহে হয়েছিল। প্রতিবার বৈঠকের সময় সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে যোগাযোগ কমিটির সদস্যদের শান্তি বাহিনীর আস্তানায় থাকতে হতো। আমাকেও(এসএম শফি) ১৫ বারের মতো পানছড়ির দুধুকছড়া গ্রামে অবস্থান করতে হয়েছিল। দুধুকছড়া বিডিআর ক্যাম্প থেকে প্রতিবার ৭-৮মাইল পায়ে হেঁটে আস্তানায় যেতে হতো। বিএনপি সরকারের আমলে ৪বার সংলাপ হওয়ার পর চুক্তি স্বাক্ষরের অগ্রগতি থেমে যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালে আওয়ামীলীগ সরকার পুন:রায় ক্ষমতায় আসর পর আবুল হাসনাত মোহাম্মদ আব্দুল্লাহর নেতৃত্বে বর্তমান বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, সংসদ সদস্য মোস্তাক আহমদ চৌধুরীর নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান এবং তৎকালীন শান্তি বাহিনী প্রধান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমার নেতৃত্বে ঊষাতন তালুকদার, সুধা সিন্ধু খীসা, রূপায়ন দেওয়ানসহ ৬ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির ফলপ্রসূ বৈঠকের ফলাফল ২রা ডিসেম্বরের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার মধ্যে দিয়ে পার্বত্যবাসী তথা দেশবাসী পান।

প্রতিবেদক: আপনাদের আত্মত্যাগে অর্জিত চুক্তির সুফল দেশবাসী ভোগ করছে, ভাবতে কেমন লাগে?
এসএম শফি: তৎকালীন শান্তিবাহিনীরা তাদের নিজ জাতিগোষ্ঠীর জাতিসত্ত্বা টিকিয়ে রাখতে সশস্ত্র সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিলেন। আর আমি জননেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ও অনুপ্রেরণায় সে সময়ে যোগাযোগ কমিটিতে নাম জমা দিয়েছিলাম। দেশপ্রেম ও দলীয় প্রধানের প্রতি অনুগত হয়ে যেদিন এমন ঝুঁকিপূর্ণ কাজের জন্য রাজি হয়েছিলাম সেদিনও কোন প্রতিদানের আশা ছিল না বর্তমানেও নাই। তবে আমার নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে যথাযথ মূল্যয়ন করেছেন। কিন্তু মাঝে মাঝে চুক্তির সুফলভোগীদের ব্যবহারে কষ্ট লাগে। চুক্তির বিষয়ে প্রতিবছর সভা সেমিনার হচ্ছে। কিন্তু সেখানে আমাদের ডাকা হয়না। তখন কষ্ট লাগে!

প্রতিবেদক: চুক্তি স্বাক্ষর যদি না হতো তাহলে পার্বত্য চট্টগ্রামের অবস্থা কি হতো বলে মনে করেন?
এসএম শফি: চুক্তি পূর্ববর্তী সমস্যাগুলোকে যদি প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক সমস্যা বিবেচনা না করে চলতে দিতেন তাহলে পার্বত্য চট্টগ্রাম এতোদিনে রক্ত নদীতে পরিণত হতো। শেখ হাসিনার পক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মতো এমন একটি চুক্তি তৃতীয় কোন পক্ষের সহায়তা ছাড়া করা সম্ভব হয়েছে কারণ তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা বলে।

প্রতিবেদক: অসুস্থতার মধ্যেও সময় দেয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
এসএম শফি: আপনাকেও অসংখ্য ধন্যবাদ।

Print Friendly, PDF & Email

Share This:

খবরটি 325 বার পঠিত হয়েছে


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*
*

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.

ChtToday DOT COMschliessen
oeffnen