শিরোনামঃ

সুযোগ করে দিচ্ছে জেলা পরিষদ

ডেপুটিশনে শহরমূখী হচ্ছে শিক্ষক, ভেঙ্গে পড়ছে দুর্গম পাহাড়ের প্রাথমিক শিক্ষা

বিশেষ প্রতিনিধি, সিএইচটি টুডে ডট কম। প্রতিমাসে জেলার উপজেলার বিদ্যালয়গুলো থেকে শিক্ষকদের রাঙামাটি পৌর শহরের বিদ্যালয়গুলোতে ডেপুটিশনে (সংযুক্তি) আনছে জেলা পরিষদ। শিক্ষকের ব্যাক্তি স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে বছরের পর বছর এ কাজ করে চলেছে। এ কারণে ভেঙ্গে পড়েছে দুর্গম উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা। শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই অবস্থা চলতে থাকলে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ধংস হবে।

রাঙামাটি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার জিল্লুর রহমান বলেন, আমি ডেপুটিশনের বিপক্ষে। কিন্তু এটি সংক্রামিত রোগ হয়েছে। পাহাড়ের প্রতিটি শিশু শিক্ষার আলোয় আলোকিত হোক আমি মনে প্রাণে চায়। প্রাথমিক বিভাগটি জেলা পরিষদের হস্তান্তরিত বিভাগ। পরিষদের নির্দেশ মতে আমাদের চলতে হয়।

জে. প্রা. শিক্ষা অফিসের তথ্যমতে, গেল বছর ডিসেম্বর থেকে চলতি বছর মার্চ পর্যন্ত ৩ মাসে মোট ৪০ জন শিক্ষককে অন্য উপজেলা থেকে রাঙামাটি পৌর এলাকার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে ডেপুটিশনে আনা হয়েছে। এর মধ্যে বরকল উপজেলা থেকে ৯ জন, লংগদু ৭, বাঘাইছড়ি থেকে ৫, জুরাছড়ি থেকে ৪, রাজস্থলী ২, নানিয়াচর ও কাপ্তাই থেকে একজন এবং রাঙামাটি সদরের শহর থেকে দুর এলাকার বিদ্যালয় থেকে ১১ জন।
এদের নিউ রাঙামাটি স. প্রা. বিদ্যালয়ে ডেপুটিশনে ৫ জন। এতে লক্ষীপুর জেলা থেকে আসা হ্যাপী করও আছেন।
এছাড়া যগনাছড়ি স. প্রা. বিদ্যালয়ে ৪, স্বর্ণটিলা স. প্রা. বিদ্যালয়ে ৩, আসামবস্তি স. প্রা. বিদ্যালয়ে ৪, রাণী দয়াময়ী স. প্রা. বিদ্যালয়ে ২, গোধুলী আমানতবাগ স. প্রা. বিদ্যালয়ে ২, কাঠালতলি স. প্রা. বিদ্যালয়ে ২, পুরাণ পাড়া স. প্রা. বিদ্যালয়ে ২, দক্ষিণ কুতুকছড়ি স. প্রা. বিদ্যালয়ে ২ জন, দক্ষিণ বালিকা স. প্রা. বিদ্যালয়ে ২, বিলাইছড়ি পাড়া স. প্রা. বিদ্যালয়ে ২ এবং রাজা নলিলাক্ষ রায় স. প্রা. বিদ্যালয়, বনরূপা মড়েল স. প্রা. বিদ্যালয়, যোগেন্দ্র দেওয়ান পাড়া স. প্রা. বিদ্যালয়, শাহ স. প্রা. বিদ্যালয়, ভেদভেদী স. প্রা. বিদ্যালয়, ত্রিদিব নগর স. প্রা. বিদ্যালয়, চন্দ্র হরি স. প্রা. বিদ্যালয়, ভাগ্যধন কার্বারী পাড়া স. প্রা. বিদ্যালয়, পুলিশ লাইন সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং কেরেটকাটা স. প্রা. বিদ্যালয়ে একজন করে ডেপুটিশনে আনা হয়েছে।

রাঙামাটি জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি সভাপতি অমল চাকমা বলেন, ডেপুটিশনে আসার অনুমতি দিচ্ছেন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান। তিনি বন্ধ করতে পারেন। তিনি একের পর এক অনুমতি দিয়ে যাচ্ছেন। এই শিক্ষকরা যে বিদ্যালয়ে নিয়োগ পেয়েছেন তারা সে বিদ্যালয়ের নামে বেতন ভোগ করছেন। অথচ থাকছেন রাঙামাটি পৌর শহরে। পৌর বিদ্যালয়ে কোন শূণ্যপদ নেই। অথচ প্রতিটি বিদ্যালয়ে ডেপুটিশনের শিক্ষক আছেন। ডেপুটিশনে আসার কারণে পদটি যেমন শূণ্য হচ্ছে না তেমনি কাউকে নেওয়াও যাচ্ছে না। ফলে দুর্গম এলাকার শিশুদের শিক্ষা অন্ধকারে নিমজ্জিত হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিশ্চিুক পৌর শহরের এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বলেন, যারা ডেপুটিশনে আমার বিদ্যালয়ে আছেন তারা আমার কথা শুনেন না। একটু চাপ দিলে স্বামী বা তার কোন আত্মীয়ের রাজনৈতিক ক্ষমতা দেখায়। বলতে পারছি না সইতেও পারছি না। আরেক প্রধান শিক্ষিকা বলেন, আমার দায়িত্ব কিছুটা কমে গেছে। তারা স্ব ইচ্ছায় আসছে। আমার কোন সমস্যা হচ্ছে না বরং আমি সুখে আছি।
শিক্ষাবিদ নিরূপা দেওয়ান বলেন, শিশুরা শিক্ষা পাচ্ছে না এটি ভাবতে কষ্ট হয়। জেলা পরিষদের কাছ থেকে আমরা ভাল কিছু পাবার প্রত্যাশা করি। কিন্তু এই ধরণের অবস্থা আমাদের হতাশ করে। উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দার সনদ দেখিয়ে চাকুরি নেন শিক্ষকরা। বাস্তবে আসলে তা নয়। এ ক্ষেত্রে জেলা পরিষদের দুর্বলতা রয়েছে বলতে হবে। একজন শিক্ষক কর্মস্থল ফেলে বছরের পর শহরে পড়ে থাকছে। অথচ কোন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। শিশুরা শিক্ষা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে না। হাজারো শিশুর স্বার্থকে না দেখে ব্যাক্তি শিক্ষকের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া জেলা পরিষদের ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ।

রাঙামাটি জেলা পরিষদের সদস্য সুবীর চাকমা বলেন, এই ডেপুটিশনের বিপক্ষে আমার অবস্থান। কিন্তু তা হচ্ছে এবং মারাত্মক আকারে হচ্ছে। এখন দেখা যাচ্ছে ডেপুটিশনে আসা শিক্ষকরা বিদ্যালয়ের মুল শিক্ষকদের মুল্যায়ন করছে না। এতে শিক্ষকদের মধ্যে দ্বন্দ সৃষ্টি হচ্ছে।
আরেক সদস্য রেমলেয়ানা পাংখো বলেন, আমিও এর বিপক্ষে। তবে আমার বিলাইছড়ি উপজেলা থেকে একজন মাত্র আনা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিশ্চুক এক শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, এভাবে শিক্ষা ব্যবস্থা চলতে পারে না। প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুরো ধংস করা হচ্ছে। একটি নিয়মের মধ্যে আসা দরকার। ডেপুটিশনে যারা আসছে তারা সবাই রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করছে। এমনও উদারহরণ আছে যে এক শিক্ষিকা তার কর্মজীবনে ১২ বছরের মধ্যে কর্মস্থলে ছিলেন মাত্র ৬ মাস। অথচ তিনি সেই কর্মস্থলের নামে বছরের পর বছর বেতন ভোগ করেছেন। এতে আমাদের কোন হাত নেই। আমরা অসহায়। জনগণকে সচেতন হতে হবে।
বাঘাইছড়ি উপজেলার মাহিল্যা স. প্রা. বিদ্যলয়েল প্রধান শিক্ষক মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, আমার বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা সাড়ে তিন’শর উপরে। শিক্ষক পদ ৮টি। দুজন বদলী হয়ে অন্যত্র চলে গেছেন। ২ জন ডেপুটিশনে রাঙামাটি শহরে। একজন পেনশনে গেছেন। একজন প্রশিক্ষণে গেছেন। আমরা দুজন আছি। ডেপুটিশনের ঠেকাতে অনেক চেষ্টা করেছি কিন্তু কাজ হয়নি। এখন প্রতি শিক্ষার্থী হতে মাসে ১০ টাকা হারে চাঁদা নিয়ে ৪ জন খন্ডকালীন শিক্ষক রেখেছি। ডেপুটিশনরা শহরে থাকলেও আমার বিদ্যালয় থেকেই বেতন ভোগ করছে।
বরকল উপজেলার সহকারী শিক্ষক তোহিদুল ইসলাম অনেক শিক্ষক যুগের পর যুগ একটি বিদ্যালয়ে পড়ে আছে। আর অনেকে আজকে চাকুরিতে যোগ দিয়ে কাল চলে আসছে। এতে অর্থ ও রাজনৈতিক ক্ষমতা কাজ করে। শিশুদের শিক্ষা যেদিকে যাক তাদের কোন মাথা ব্যথা নেই।

রাঙামাটি সদর উপজেলা চেয়ারম্যান অরুন কান্তি চাকমা বলেন, আমার উপজেলায় কাউকে ডেপুটিশনে আনা হলে উপজেলা শিক্ষা সংক্রান্ত কমিটির মতামত নেওয়া দরকার। কিন্তু করা নেওয়া হয় না। শুধু একটি কাগজ ধরিয়ে দিয়ে তাদের বেতনের ব্যবস্থা করে দিতে বলা হয়। দুর্নীতি ও অনিয়মের একটা সীমা থাকা দরকার সেই সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে দুর্গম এলাকার প্রাথমিক শিক্ষা অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে।
এ ব্যাপারে রাঙামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বৃষকেতু চাকমা বলেন, আমার হাতে প্রতিনিয়ত ডেপুটিশনে আবেদন আসছে। সাথে সাথে রাজনৈতিক চাপও আসে। এটি পুরো বন্ধ করতে আমি চেষ্টা করছি। বিগত সময়ে ডেপুটিশনে যাদের আনা হয়েছে তাদের নির্ধারিত সময় শেষে ফেরত পাঠানো হবে। আর কাউকে সুযোগ দেওয়া হবে না। এলাকার জনপ্রতিনিধি অবিভাবকরা সচেতন হতে হবে। এতে আমার কাজ করতে সুবিধা হবে। আমিও চায় পাহাড়ের প্রতিটি শিশু শিক্ষার আলোয় আলোকিত হোক।

on

খবরটি 126 বার পঠিত হয়েছে


Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*
*

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.

ChtToday DOT COMschliessen
oeffnen