শিরোনামঃ

সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও সরকারী বেসরকারী উদ্যোগের অভাব

এক বছরেও পার্বত্য জেলা পরিষদগুলো পর্যটন নীতিমালা করতে পারেনি

সিএইচটি টুডে ডট কম, রাঙামাটি। গতবছর পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের উদ্যেগে পার্বত্য জেলাগুলোতে পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা নিয়ে দুইবার সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়, সেমিনারে ৩ খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি এবং বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদকে পার্বত্য কৃষ্টি কালচারকে সমুন্নত রেখে পর্যটন নীতিমালা তৈরি করতে বলা হলেও এক বছরেও তারা নীতিমালা তৈরি করতে পারেনি। পর্যটন rangamati-julonta-setuশিল্পে অপর জেলা এগিয়ে গেলেও পিছিয়ে রয়েছে রাঙামাটি। অথচ এখানে ঝর্না, ঝুলন্ত সেতু, লেক পাহাড়সহ রয়েছে অফুরন্ত সম্পদ। শুধু আন্তরিকতা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও সরকারী উদ্যোগ না থাকায় প্রাচ্যর রানী খ্যাত রাঙামাটি পর্যটন শহর হিসেবে গড়ে উঠতে পারছে না।
পর্যটকরা রাঙামাটিতে ঘুরতে এসে নয়নাভিরাম কাপ্তাই লেক, ঝুলন্ত সেতু রাজ বনবিহার ও সুভলং ঝর্না দেখার পর তাদের দেখার মত কোন স্থাপনা না থাকায় তারা অনেকটা হতাশ ফিরে যান। রাঙামাটিতে বেড়াতে আসা পর্যটকরা ক্যাবল কার, শিশু পার্ক, পর্যটনে খাওয়ার ব্যবস্থা এবং পর্যটকদের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধির দাবী জানান। কেবল পর্যটন মৌসুমে পর্যটকরা আসলেও সব সময় আসেন না, সব সময় পর্যটকদের অবাধ বিচরনের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। কারো কারো মতে স্বাধীনতার পরও রাঙামাটি শহরের মাষ্টার প্ল্যান না হওয়ায় পর্যটন বিকশিত হতে পারছে না। এছাড়া রয়েছে নিরাপত্তা জনিত কারনে বিদেশী পর্যটকদের অবাধ যাতায়াতে করাকরি আরোপ। ২০১৪সনে পার্বত্য চুক্তি অনুযায়ী জেলা পরিষদে হস্তান্তর করা হয়েছে পর্যটন বিভাগকে কিন্তু তারা প্রত্যাশিত কিছু করতে পারেনি। পর্যটন শিল্পকে বিকশিত করতে রাঙামাটিতে দুটি সেমিনার হলেও সেগুলোর বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়নি। পার্বত্য মন্ত্রনালয়ের সচিব জানান জেলা পরিষদগুলোকে নীতিমালা তৈরি করতে বলা হয়েছে কিন্তু তারা নীতিমালা তৈরি করতে না পারায় আমরা কার্যকর উদ্যেগ নিতে পারছি না। জেলা পরিষদের ধীরগতিতে চলায় হতাশ ব্যবসায়ীরা। জেলা পরিষদের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন তারা অবকাঠামোর ডিজাইন ও পরিকল্পনা তৈরি করতে উপদেষ্টা ফার্ম নিয়োগ দিয়েছে।

২০১৬সনকে সরকার পর্যটন বর্ষ ঘোষনা করলেও পাহাড়ী জনপদ রাঙামাটির পর্যটন উন্নয়নে নেয়া হয়নি কোন উদ্যোগ।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের সচিব নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা এনডিসি পর্যটন বিষয়ে একান্ত আলাপচারিতায় বলেছেন, আমরা জেলা পরিষদ গুলোকে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অনুরোধ করেছি যে, জাতীয় পর্যটন নীতিমালার আলোকে এখানকার স্থানীয় পর্যটকদের প্রণয়ন করার জন্য,এই কাজটা তারা এখনো করতে পারেনি। সরকার ২০১৬ সনকে পর্যটন বর্ষ হিসাবে ঘোষণা করেছে। আমার জানা মতে পর্যটন মন্ত্রণালয় সরকারের কাছ থেকে কিছু রবাদ্দ পেয়েছে সেই বরাদ্দও কিন্তু আমরা পায়নি। তারপরের আমরা আমাদের নিজেদের উদ্যেগে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছি। এখানে পর্যটনের সম্ভাবণাকে কাজে লাগিয়ে পর্যটন শিল্পকে এখানকার মানুষের উপকারে যাতে আসে সেজন্যে বান্দরবানের রুমা উপজেলায় একটি আঞ্চলিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর এন্ডিকেডেট মাউন্টেট ডেভলেপমেন্ট এর সহায়তায় সেখানে স্থানীয় মানুষজনকে ট্যুরিজম নিয়ে পরিবেশের ক্ষতি না করে আমরা সেখানে কিছু মানুষকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। যেখানে পর্যটকরা কম খরচে থাকতে পারবে। সেখানে একটা দুইটা রুমে ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে। এইখানে থাকার মত ব্যবস্থা হবে। খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা হবে। ট্যুরিজম স্থানীয় মানুষজনরা তারা সেবা প্রদান করবে। রুমার রিঝুক ঝর্নায় চলাচলের জন্য সেখানে আমরা একটা নৌকা কিনে দিয়েছি। পরিবেশ নষ্ট না করে যাতে পর্যটকরা বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান দেখতে পারে এবং কিছু কিছু ব্যক্তি উদ্যোগেও মানুষ এখন এখানে পর্যটনের যে ফ্যাসিলিটি তারা তৈরী করছে । যেমন সাজেক এ আপনারা দেখবেন তাদের ব্যক্তিগত উদ্যোগেও বিভিন্ন ফ্যসিলিটি দিচ্ছে। সবাইতো আর ধনী লোক না যে ৫০০০-১০০০০ টাকা দিয়ে থাকবে। ১০০-২০০-৩০০ টাকা দিয়ে যাতে থাকতে পারে, সেই ধরনের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।53

রাঙামাটির পর্যটন বিষয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের সচিব নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা আরো বলেন, যেহেতু স্থানীয় পর্যটন জেলা পরিষদে হস্তান্তর করা হয়েছে তাই এই উদ্যেগটা জেলা পরিষদকে নিতে হবে। আমরা পর্যটন কমপ্লেক্সে ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি মোটেল নির্মান করে দিয়েছে এর ব্যবস্থাপনায় রয়েছে জেলা পরিষদ। আমরা উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে ডিসি বাংলোতে যে পলওয়ে পার্ক আছে সেখানে আমরা আরো উন্নয়নমূলক কাজ করব। আরেকটা আমরা চিন্তা করছি এখানে একটা ভিউ ইন টাওয়ার করে দেব যাতে করে উপর থেকে এখানে শহরের যে কাপ্তাই লেকের আছে তার সৌন্দর্য অবলোকন করা যায়।
তবে পর্যটন বিকাশে মূল উদ্যেগটা স্থানীয় ভাবে নিতে হবে। শুধু ফ্যাসিলিটিজ দিলে হবে না, এখানে পর্যটন বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। পর্যটকরা যদি ভাল ব্যবহার না পায়, সুযোগ-সুবিধা, পরিষ্কার পরিছন্ন, ছিনতাই এইগুলো যদি ঘটে তাহলে এইখানে মানুষ আসবে না। যদি পর্যটন এলাকায় কোন অসামাজিক কর্মকান্ড চলে , যদি হোটেল মোটেলে অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটে তাহলে এখানে পর্যটক আসবে না। পর্যটনের জন্য তাই সুন্দর একটি পর্যটন বান্ধব পরিবেশ তৈরী করতে হবে এটার দায়িত্ব স্থানীয়দের. তাহলেই কেবল এখানে পর্যটক আসবে। সব জায়গায় পর্যটক আসে রাঙামাটিতে কম আসে কারণ আমরা এখনো পর্যটনের সুন্দর পরিবেশ তৈরী করতে পারি নাই।
তিনি আরো বলেন, আমাদের ইচ্ছা আছে রাঙামাটির পর আরেকটা ঢাকায় সেমিনার করবো পর্যটন মন্ত্রীকে নিয়ে। যাতে তিন পার্বত্য জেলা পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বৃষ কেতু চাকমা পর্যটন নীতিমালা সর্ম্পকে বলেন, আমরা শীগ্রই নীতিমালা তৈরি করে মন্ত্রনালয়ে জমা দিব। তিনি আরো বলেন, অবকাঠামোর ডিজাইন ও পরিকল্পনা তৈরি করতে আমরা উপদেষ্টা ফার্ম নিয়োগ দিয়েছে তারা শীঘ্রই কাজ শুরু করবে। কাজ শুরু করলে আমরা কোন জায়গায় কি করতে পারব সে ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারব। তবে পর্যটনের জন্য আমাদের আলাদা কোন বরাদ্দ নেই, মন্ত্রনালয় বরাদ্দ দিলে আমরা কাজ করতে পারব।

রাঙামাটির বিদায়ী জেলা প্রশাসক সামসুল আরেফীন বলেছেন, পর্যটনের অপার সম্ভাবনাময় অঞ্চল রাঙামাটি। এখানকার ঝুলন্ত ব্রীজ, কাপ্তাই লেক, শুভলং ঝর্না অনেক পুরানো হয়ে গেছে তাই মানুষ ঘুরতে এসে এগুলো দেখার পাশাপাশি আরো কিছু দেখতে চায়। আরো কিছু করতে হলে আপনাকে পর্যটন স্থাপনের বাধা দুর করে জনগনকে আস্থায় আনতে হবে। পর্যটকদের নিরাপত্তা দিতে হবে। এখানে ঘুরতে গেলে নির্বিঘেœ পর্যটনের স্থান ঘুরে আসতে পারবে কিনা এবং যারা এখানে ইনভেষ্টমেন্ট করবে তাদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ যিনি বিনিয়োগ করবেন তিনিও চাইবেন যেন তার বিনিয়োগ তুলে আনার এবং তুলে আনার মধ্যে যদি তার কোন আশংকা, ভয় ভীতি থাকে, তাহলে তিনি এইখানে বিনিয়োগ করবেন না। পর্যটন শুধু মাত্র প্রাকৃতিক কারণেই সব কিছু পর্যটন হয়ে যাবে তা কিস্তু না কিছু বিনিয়োগও করতে হবে। কারণ এখানে যখন পর্যটক আসবে তাকে কিছু সুযোগ সুবিধা দিতেই হবে। তার থাকা-খাওয়া, তার চলা-ফেরা সব কিছুর। এসব কিস্তু বিনিয়োগ ছাড়া হয় না। সব কিছুতেই সুযোগ-সুবিধা পর্যটকদের দিতে হবে। পর্যটকদের যদি সুযোগ-সুবিধা দিতে না পারি তাহলে পর্যটকরা শুধু মাত্র লেক, পাহাড়, ঝর্ণা দেখার জন্য আসবে না। এসবের সাথে আনুসাঙ্গিক কিছু বিষয় থাকে। সেটা যদি আমরা নিশ্চিত করতে পারি তাহলে রাঙামাটির পর্যটনের বিকাশ ঘটবে।

জেলা প্রশাসক আরো বলেন, আমি মনে করি রাঙামাটি সব চাইতে পর্যটক সম্ভাবনাময় স্থান। এটার জন্য সম্মিলিতভাবে প্রচেষ্টা করতে হবে। সব চেয়ে বড় বিষয় হল আমি যেটা মনে করি, স্থানীয় জনগনকে সম্পৃক্ত করতে হবে। স্থানীয় জনগন যখন বুঝবে যে হ্যাঁ, পর্যটন আমার দরকার, এখানে কোন শিল্প কারখানা নাই তারা যখন সম্পৃক্ত হবে তখনই পর্যটন শিল্প গড়ে উঠবে। স্থানীয় জনগনকে সম্পৃক্ত করতে পারলে পর্যটন শিল্পের যেভাবে প্রসার ঘটবে তেমনিভাবে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না।
তিনি আরো বলেন, ব্যাক্তিগতভাবে পর্যটনের জন্য আমি ছোট খাট কিছু উদ্যেগ নিয়েছিলাম কিন্তু একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের বাধা আসায় করতে পারিনি।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ পর্যটকদের জন্য বিনোদন বা আলাদা কোন কিছু সৃষ্টি করতে না পারায় তারা আসছে না। একই জিনিস আর কত দেখবে।
রাঙামাটি হোটেল মালিক সমিতির সাধারন সম্পাদক নিজাউদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রাঙামাটিতে পর্যটকরা পদে পদে হয়রানির শিকার হয়। রাঙামাটি শহরে প্রবেশ করতে ৩বার দিতে হয় ট্যাক্স দিতে হয়। আবার শহরে আসলে ট্রাফিক হয়রানি, পর্যটনে গাড়ী রাখলেই টাকা। এসব হয়রানির পর তাদের ঝুলন্ত ব্রীজ, কাপ্তাই লেক, শুভলং ঝর্না দেখার পর আর কিছু দেখার থাকে না।
তিনি আরো বলেন, পর্যটকদের ধরে রাখতে পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে হবে, জেলা প্রশাসনের সাথে জেলা পরিষদের সমন্বয় করতে হবে। পর্যটকদের জন্য নতুন কিছু সৃষ্টি করতে হবে, না হয় রাঙামাটি এক সময় পর্যটক শুন্য হয়ে পড়বে।12-73

রাঙামাটিকে পর্যটন শহর বলা হলেও এটি পর্যটক তথা দেশ বিদেশে তোলে ধরতে নেই কোন উদ্যোগ। পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে রাঙামাটির বিশাল সম্ভাবনাময় পর্যটন খাতকে এগিয়ে নিতে সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ে উদ্যোগ নিলে এটি হতে পারে বাংলাদেশে আয়ের অন্যতম।

on

খবরটি 160 বার পঠিত হয়েছে


Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*
*

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.

ChtToday DOT COMschliessen
oeffnen