শিরোনামঃ

বিজয়ের সাড়ে চার দশক পরও রামগড়ে গড়ে উঠেনি প্রয়োজনীয় স্মৃতি সংগ্রহ

একাত্তরের ৮ ডিসেম্বর শত্রুমুক্ত হয়েছিল সীমান্ত শহর রামগড়

সিএইচটি টুডে ডট কম, খাগড়াছড়ি। ২৫ শে মার্চেও কালো রাত্রির পর চট্টগ্রাম অঞ্চলেও তৎকালীন আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে বৃহত্তর চট্টগ্রামে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠে। পাকিস্তানী হায়েনাদের আক্রমণের মুখে কৌশলগত কারণে রামগড় হয়ে উঠে নির্ভরর প্রতিরোধ বূহ্য। কিন্তু ২ মে রামগড়ের পতন ঘটলে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, সামরিক কর্মকর্তা এবং বেসামরিক যোদ্ধারা ভারতে পাড়ি জমান। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তাই সীমান্তশহর রামগড়ের রয়েছে গৌরবোজ্জল ইতিহাস। দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধের কাছাকাছি সময় ৮ ডিসেম্বর রামগড়কে হানাদার মুক্ত করেন অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধারা।
কিন্তু সেই ইতিহাস   মন্ডিত জনপদে গড়ে উঠেনি মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রয়োজনীয় সংগ্রহশালা অথবা যথাযথ স্মৃতিচিহ্নও। আর যেসব ভাষ্কর্য্য গড়ে তোলা হয়েছে তাও এখন অরক্ষিত এবং অসম্পূর্ন অবস্থায় পড়ে আছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বৃটিশ আমলের মহকুমা শহর রামগড়ের পাশ দিয়েই বয়ে গেছে সীমান্ত নদী ফেনী। অবস্থানগত কারণে শহরটি তৎকালীন ভারত এবং পূর্ব-পাকিস্তানের জন্য গুরুত্বপূর্ন ছিল। ভূ-রাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধেও তাই রামগড় হয়ে উঠেছিল ট্রানজিট পয়েন্ট। বৃহত্তর চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ পাকিস্তানী হায়েনার হাত থেকে বাঁচতে এ পথেই শরণার্থী হয়েছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম পরিকল্পনা কেন্দ্র হিসেবেও রামগড়ের স্থান ইতিহাস স্বীকৃত। ১নং সেক্টরের অনেক রাজনৈতিক এবং সামরিক সংগঠক রামগড় হয়েই ভারতে পাড়ি জমান।

গত মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা গেছে, রামগড় উপজেলা পরিষদের প্রবেশমুখে হ্রদের পাড়ে শহীদ মিনার এলাকায় ভাষ্কর মৃণাল হকের নির্মিত ‘বিজয়’ নামের একটি ভাষ্কর্য্য রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম ৭ বছর আগে এটি উদ্বোধন করেন। কিন্তু ভাষ্কর্য্যটি উপরের অংশটি এখনো অসম্পূর্ন। উপজেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা জানিয়েছেন, এই ভাষ্কর্য্যরে ঠিকাদার সমুদয় তুলে নিয়ে গেছেন। ভাষ্কর মৃণাল হকও পুরো টাকা পাননি। ফলে ভাস্কর্য়্যটি অসম্পূর্ন রয়ে গেছে।
তাছাড়া ভাষ্কর্য্যরে পাশেই জাতির পিতার সাত মাচেংর জনসভার আদলে টেরাকোটার একটি শিল্পকর্ম রয়েছে। এসব স্থাপনা একেবারে উন্মুক্ত এবং অরক্ষিত হওয়ায় বেশিরভাগ সময় অবাধে প্রবেশ করে গবাদিপশু।

অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও বীর মুক্তিযোদ্ধা সমর কৃষ্ণ চক্রবর্তী বলেন, ৬ ডিসেম্বর সকালবেলা বিমান বাহিনী রামগড় এবং পাশর্^বর্তী এলাকায় বিমান হামলা করেন। এতে পাহ হায়েনাদের মনোবল ভেঙ্গে পড়ে। তাঁরা চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টের দিকে পালানোর প্রস্তুতি নিতে থাকে। তখনকার রামগড়ের আওয়ামীলীগ কর্মী মুনশি মিয়া খবর দেন যে, পাকিস্তানী সেনাবাহিনী সরে গেছে। খবর পেয়ে আমরা আট ডিসেম্বর বিকেলে আমরা রামগড় পৌঁছি। রামগড় শহরকে সম্পূর্ন শত্রুমুক্ত করে মুক্তাঞ্চল ঘোষণা করি।
তিনি বলেন, রামগড়কে মুক্তাঞ্চল ঘোষণার সময় আমাদের কমান্ডিং নেতা হেমদা রঞ্জন ত্রিপুরা, রণ বিক্রম ত্রিপুরা এবং তৎকালীন আওয়ামীলীগ নেতা সুলতান আহমদ (প্রয়াত)সহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
মুক্তিযোদ্ধা মনছুর আহমেদ বলেন, মরহুম সুলতান আহমেদের নেতৃত্বে দুপুরের দিকে রামগড়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। তখন থেকেই রামগড় মুক্ত দিবস পালন হয়ে আসছে।

মুক্তিযোদ্ধা কালাচাঁদ দেববর্মণ বলেন, আমাদের তখন ফুর্তি, ফুর্তি করে রামগড়ে প্রবেশ করি। তখন তো রোড এরকম ছিল না। ধুরি রোড, পাহাড়ি রোড। ভারত থেকেও অনেক লোক এসে গেছে। মা-বাবা-স্বজন সবার সাথে দেখা করি।
রামগড় উপজেলা নির্বাহী অফিসার আল মামুন মিয়া বলেন, আট ডিসেম্বর রামগড় মুক্ত দিবস উপলক্ষে অন্যান্য বছরের মতো এবারও কমৃসূচি নেয়া হয়েছে। সকালে রাজনৈতিক নেতাকর্মী, সর্বস্তরের মানুষসহ শোভাযাত্রা শেষে শহীদ বেদীতে পুস্পস্তবক দেয়া হবে।
খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো: রাশেদুল ইসলাম বলেন, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের ক্ষেত্রে রামগড়ের বিশাল ভূমিকা রয়েছে। আট ডিসেম্বর রামগড় মুক্ত হয় হানাদার বাহিনীর হাত থেকে। এখানে লক্ষ্যনীয় যে, উচ্চ পর্যায়ের যাঁরা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ছিলেন, তাঁদের ভূমিকা ছিল। সামরিক নেতৃবৃন্দ ছিলেন, তাঁদের ভূমিকা ছিল। তৎকালীন ডিসি এইচ টি ইমাম স্যার’র বিশেষ ভূমিকা ছিল। এখান দিয়ে বহু শরণার্থী ভারতে আশ্রয় জন্য এই পথকে ব্যবহার করেছে। সার্বিকভাবে কৌশলগত একটা বিশেষ ভূমিকা ছিল। আমরা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি এবং অন্যান্য বিষয়গুলো ধরে রাখার জন্য কার্যকর ভূমিকা নেবো। বিশেষ করে যে স্মৃতিস্থম্ভগুলো অসমাপ্ত আছে, সেগুলো আরো সুন্দরভাবে সমাপ্তির জন্য সরকারের সহায়তায় পদক্ষেপ নেবো।
তিনি বলেন, স্থানীয় জনগণের চাহিদার ভিত্তিতে যাদুঘরসহ অন্যান্য অবকাঠামোও গড়ে তোলা যেতে পারে। এবং রামগড়ে নির্মিত অসম্পূর্ন ভাষ্কর্য্যরে পূর্ন নির্মাণ এবং বাদবাকী শিল্পকর্ম সংরক্ষনের ব্যবস্থা নেয়া হবে।
বৃহত্তর চট্টগ্রামের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সূতিকাগার হলেও রামগড়ে গড়ে উঠেনি ঐতিহাসিক কোন স্থাপনা। ১৯৭১ সালের পোস্ট অফিস এলাকা, যেখানে মুক্তাঞ্চল ঘোষণা আনুষ্ঠানিকতা হয়েছিল; সে স্থানেও নেই কোন স্মৃতিচিহ্ন। ফলে নতুন প্রজম্মের কাছে রামগড়ের মুক্তিযুদ্ধকালীন অনেক স্মৃতিই অজানা থেকে যাচ্ছে।

Print Friendly, PDF & Email

Share This:

খবরটি 31 বার পঠিত হয়েছে


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*
*

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.

ChtToday DOT COMschliessen
oeffnen